fbpx
সোমবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:২০ পূর্বাহ্ন

আফগানিস্তান থেকে পলায়ন, অতীতের যেসব ইতিহাস মনে করিয়ে দিল আমেরিকা

অনলাইন
  • আপডেট টাইমঃ সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২১
  • ৬ বার পঠিত

গত ১৫ আগস্ট রাজধানী কাবুল দখলের মাধ্যমে আফগানিস্তানের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় তালেবান। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ২০ বছর পর দেশটিতে আমেরিকার দখলদারির অবসান হয়। ক্ষমতায় ফেরে বিদ্রোহী গোষ্ঠী তালেবান।

গত ১৫ আগস্ট কাবুল দখলের আগেই আফগানিস্তান ছেড়ে যেতে থাকে পশ্চিমা বাহিনী। রাতের অন্ধকারে বিমান নিয়ে উড়াল দেয় মার্কিন বাহিনী। একের পর এক প্রদেশ দখল করে নিতে থাকে তালেবান যোদ্ধারা। অবস্থা বেগতিক দেখে হেলিকপ্টারে দেশ থেকে পালিয়ে যায় প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনিও। শেষ পর্যন্ত চুক্তি অনুযায়ী ৩১ আগস্টের মধ্যে আনুষ্ঠানিকভাবে আফগানিস্তান থেকে সকল সৈন্য প্রত্যাহারের বিষয়টি বাস্তবায়ন করে আমেরিকা। এভাবেই পরাজয় ঘটে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের।তবে মার্কিনিদের এই পরাজয় অতীতের কিছু ইতিহাস স্বরণ করিয়ে দিল বিশ্ববাসীকে।

১৭৭৬ সালের আগস্ট মাসে, ব্রুকলিনের যুদ্ধে প্রবলভাবে পরাজিত হয়েছিলেন আমেরিকার দেশব্রতীদের সর্বাধিনায়ক তথা পরবর্তীকালে স্বাধীন আমেরিকার প্রথম প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াশিংটন। তার ৯,০০০ যোদ্ধা সম্বলিত বাহিনীকে ইস্ট নদীর তীরে আটকে রেখেছিল ব্রিটিশ শক্তি। সুপরিকল্পিত পশ্চাদপসরণ ছাড়া সেদিন ওয়াশিংটন বাহিনীর আর রক্ষা পাওয়ার পথ ছিল না। প্রবল বৃষ্টিতে কিছুই ভাল করে দেখা যাচ্ছিল না। আর, সেই সুযোগেই অন্ধকার থাকতে যত বেশি সম্ভব নৌকা জড়ো করে ফেলার নির্দেশ দেন ওয়াশিংটন। পর দিন সকালে বিস্মিত ব্রিটিশরা দেখেছিলেন, যে ভুঁইফোঁড় সেনাকে তারা খতম করার কথা ভাবছিলেন, তারা বেমালুম গায়েব হয়ে গিয়েছে! সে যুদ্ধে বেঁচে যান ওয়াশিংটন, প্রস্তুতি নেন আরও একটা লড়াইয়ের এবং শেষ পর্যন্ত তার নতুন দেশকে ব্রিটিশদের হাত থেকে স্বাধীন করেন।

গত মাসে এমনই এক পশ্চাদপসরণের সিদ্ধান্ত নেন ওয়াশিংটনের ৪৬তম উত্তরসূরি, আমেরিকান প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। এবার সুদূর আফগানিস্তান থেকে, যেখানে তাদের দীর্ঘতম যুদ্ধ লড়েছেন আমেরিকানরা। হেরেছেনও বটে। স্বভাবতই সমর-ইতিহাসবিদ এবং ভূ-রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের প্রশ্ন জাগবে, এই পরাজয় কি সাময়িক, না কি তা আমেরিকান ইতিহাসের গতিপথ পাল্টে দিতে পারে। যুদ্ধের ফলাফল ইতিহাসের গতিপ্রকৃতির ওপর যতটা নাটকীয় প্রভাব ফেলে, তেমন আর কিছুই ফেলে না। ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কের হিসাব-নিকাশ, সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন এবং মহাদেশের ভবিষ্যৎ বুঝতে অতীতের যুদ্ধগুলো নিয়ে পড়াশোনা করেন এখনকার গবেষকেরা। যেমন অনেকেই প্রাচীন গ্রিসে শক্তিশালী আথেন্স ও দুর্দান্ত স্পার্টানদের মধ্যে সংঘটিত ‘পেলোপনেশিয়ান ওয়ার্স’ (৪৩১-৪০৪ খ্রিস্টপূর্বাব্দ) নামক যুদ্ধটি খুব মন দিয়ে পড়েন। সিরাকুসে আথেন্সের ব্যর্থ আক্রমণ পাল্টে দিয়েছিল এই দীর্ঘ লড়াইয়ের অভিমুখ। তা আথেন্সের ক্ষমতার ওপর এক চিরস্থায়ী আঘাত করেছিল, এবং ক্রমশ শেষ করে দিয়েছিল সেই অতি-সমৃদ্ধ প্রাচীন সভ্যতাকে।

ইতিহাসের আর এক বাঁক বদল ঘটে ১৯৪২-এর ফেব্রুয়ারিতে, সিঙ্গাপুরের পতনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ব্রিটিশ ভারতীয় বাহিনীর প্রচুর সৈন্যকে জাপানি আক্রমণের মুখে ফেলে চলে যান ব্রিটিশরা। ব্রিটিশ সেনাবাহিনীর ইতিহাসে এই ঘটনাকে ‘জঘন্যতম বিপর্যয়’ বলে উল্লেখ করেছিলেন উইনস্টন চার্চিল। আসলে এই ঘটনার তাৎপর্য আরও বেশি। কারণ, এর ফলে এশিয়ায় ব্রিটিশদের সম্মান একেবারে ধুলোয় মিশে গিয়েছিল। যে ৮০,০০০ সৈন্যের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করে তাদের সিঙ্গাপুরে ফেলে চলে গিয়েছিলেন ঔপনিবেশিক শাসকরা, তাদের মধ্যে ৪০,০০০ সৈন্য পরে নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মি-তে যোগ দেন এবং ইম্ফলের যুদ্ধে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধেই লড়াই করেন। আইএনএ  এবং জাপানি বাহিনী পরাজিত হলেও তাদের নিজেদের খেলাও যে শেষ, সেটা বুঝতে পারেন ব্রিটিশরা। তারা বুঝে নেন, তাদের যুদ্ধ লড়ার জন্য আর ভারতীয় সেনাদের ওপর ভরসা করা যাবে না কখনও। বিশ্বযুদ্ধ শেষ হওয়ার আগেই ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন ব্রিটিশরা। দাঁড়ি পড়ে যায় প্রায় দুই শতকের ঔপনিবেশিক শাসনে।

ফিরে দেখলে মনে হয়, যুদ্ধে পশ্চাদপসরণ ততটা বড় কথা নয়, আসল হল তার সঙ্গে জড়িত সম্মানের প্রশ্নটি। চার্চিল যথার্থই বলেছিলেন: “পরাজয় এক জিনিস, অসম্মান আর এক।” ১৯৪২-এর ২০ জুন তোবরুকের যুদ্ধে ব্রিটিশদের লজ্জাজনক আত্মসমর্পণের পরে এ কথা বলেন তিনি।

হামিদ কারজাই বিমানবন্দর থেকে আমেরিকান বাহিনীর নিষ্ক্রমণ দেখে ‘অসম্মান’ কথাটাই বারবার মনে পড়ছে। ছবিটা এ রকম— বেপরোয়া জনতা ভিড় করে পালানোর চেষ্টা করছে, আর কাবুলের আর্গ প্রেসিডেনশিয়াল প্যালেসে বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে তালেবান যোদ্ধারা। 

“এই সপ্তাহে কাবুলের ভয়ানক ছবিগুলো বিদেশের মাটিতে আমেরিকার মানমর্যাদার প্রবল ক্ষতি করেছে। ইতিমধ্যেই সেসব ছবি ব্যবহার করে তাইওয়ানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির মুখপত্র গ্লোবাল টাইমস। তারা বলেছে, চীন যদি কখনও তাদের আক্রমণ করে, তাহলে আমেরিকান সাহায্যের ওপর ভরসা না করাই ভাল।”— ফরেন অ্যাফেয়ার্স পত্রিকায় কথাগুলো লিখেছেন আমেরিকার প্রাক্তন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা রবার্ট সি ও’ব্রায়েন এবং জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রাক্তন অধিকর্তা জন র‌্যাটক্লিফ।

তারা লিখছেন, “আমরা মনে করি, বন্ধু রাষ্ট্রগুলোকে সাহায্য করা ও কূটনৈতিক অবস্থান গুছিয়ে নেওয়ার জন্য যথাশিগগিরই পদক্ষেপ করা আমেরিকার পক্ষে অত্যন্ত জরুরি, বিশেষত ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলে।”

কিন্তু ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এশিয়াজুড়ে রাষ্ট্রনেতারা গভীর চিন্তায়। ভিয়েতনাম ইতিমধ্যেই চীনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার আভাস দিয়েছে এবং বুঝিয়ে দিয়েছে, কোনও বিশ্বশক্তির পক্ষ তারা নেবে না। আফগানিস্তান থেকে বাহিনী প্রত্যাহার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে সিঙ্গাপুর। আমেরিকার ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসের সফরকালে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লুং বলেছেন, “আশা করি আফগানিস্তান আবার আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদের ঘাঁটি হয়ে উঠবে না।”

আফগানিস্তান থেকে তড়িঘড়ি সেনা প্রত্যাহার করে প্রবল সমালোচনার মুখে পড়েছেন জো বাইডেন। এই ঘটনাক্রম বলছে, বিশ্বশান্তি নিশ্চিত করতে তার ওপর ভরসা করা মুশকিল। সম্প্রতি তিনি টুইট করলেন— সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত “শুধু আফগানিস্তানের ব্যাপার নয়”, আসলে এটা “সেনা পাঠিয়ে অন্য দেশ পুনর্গঠনের জামানার অবসান।” এ কথা শুনে নড়েচড়ে বসেছেন বহু রাষ্ট্রনেতা। এর অর্থ কী? আমেরিকা কি তার নীতির প্রসার বা মিত্র দেশগুলোর প্রতি দায়বদ্ধতা পালনের জন্য আর সেনাবাহিনীকে কাজে লাগাবে না? আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক পাটিগণিতের প্রধানতম প্রশ্ন এখন এটাই এবং আমেরিকা পিছু হটলে নিশ্চিতভাবেই পা বাড়াবে চীন। 

বলতেই হয়, দেশের উদ্দেশে ভাষণে ভূ-রাজনীতি বিষয়ে বাইডেনের বিচক্ষণতার অভাব প্রকাশ পেয়েছে। তার বক্তব্য: “যারা আফগানিস্তানে যুদ্ধের তৃতীয় দশক শুরু করার কথা বলছেন, তাদের কাছে জানতে চাইব, আসল জাতীয় স্বার্থ কোনটি?”

তার কথায় এমন এক অনভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট, যা আমেরিকান প্রেসিডেন্টের পক্ষে বেশ বেমানান। আসলে, সেনা প্রত্যাহার মুখ্য প্রশ্ন নয়। যে ভঙ্গিতে তা করা হয়েছে, এবং তার সমর্থনে যা বলা হচ্ছে, সমস্যা সেখানে। এই উদ্ভ্রান্তের মতো প্রস্থানের দায় পুরোপুরি বাইডেন প্রশাসনের ওপরেই বর্তায়। অনেকে সে কথা বলছেনও। আর, এই বিপর্যয়ের জন্য পূর্বসূরিকে দোষারোপ করার চেষ্টা বাইডেনেরই সম্মান নষ্ট করছে। যখন কোনও রাষ্ট্রনায়ক এবং তার দেশ দুনিয়ার চোখে খাটো হয়ে যান, তখন শেষ অবধি সেই দেশের আন্তর্জাতিক ক্ষমতাও খর্ব হয়।

যদিও ওই ভাষণে একটা কথা ঠিক বলেছেন বাইডেন— “আরও বেশি দিন পড়ে থাকার কোনও অর্থ ছিল না।” কেননা, দীর্ঘতম এই যুদ্ধে বহু আগেই হেরে গিয়েছিল আমেরিকা, চলছিল কেবল রক্তক্ষরণ। এটাও ঠিক বলেছেন: “কুড়ি বছরের যুদ্ধ, বিবাদ, বেদনা ও বলিদানের পরে এখন ভবিষ্যতের দিকে তাকানোর সময়, অতীতের দিকে নয়…।”

কিন্তু কেমন সেই ভবিষ্যৎ? আফগানিস্তানে তার সেনার পরাজয়ের জন্য বাইডেনকে দোষ দেওয়া যায় না ঠিকই, কিন্তু তাকেও ক্ষমতা, যুদ্ধ ও পরাজয়ের চরিত্রটা বুঝতে হবে। আর্নেস্ট হেমিংওয়ের একটা মন্তব্য বোধ হয় এখানে প্রাসঙ্গিক— “যুদ্ধে নেমে পড়লে একটাই কাজ থাকে। সেটা জেতা। কেননা, পরাজয় যে অশুভ বহন করে আনে, কোনও যুদ্ধও তা আনতে পারে না।”

নিউজটি শেয়ার করুন

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো খবর...

এনএএন টিভি লাইভ

%d bloggers like this: